শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৫

হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার -প্রেমের ফাঁদ





খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে নোভা।কিন্তু আচরণ ও পোশাকে মনে হয় হাই-ফাই ফ্যামিলির মেয়ে।ছেলে বন্ধুর কোন অভাব নেই।এমনকি বাপ-চাচার বয়সী মানুষকেও এমন মিষ্টি করে ‘ভাইয়া’ করে ডাকে যে তার খপ্পরে পড়তে বাধ্য।তার হাসি,চাহনি,কথা বলার স্টাইল খুবই আকষর্ণীয়।আধুনিক পোশাক ও সাজগোজে পরিপাটি।সব ছেলেবন্ধু ও তথাকথিত ‘ভাইয়াদের’ সাথে এমন আচরণ করে যেন তাদের প্রেমে মজে গেছে অথচ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কারো সাথে সম্পর্কের গভীরে যায় না।মোবাইল ফোন,রিচার্জ,শপিং করা,ভাল রেস্টুরেন্টে খাওয়া সবই ছেলে বন্ধুদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়।সবসময় সে সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে প্রচন্ড চেষ্টা করে।স্বার্থ উদ্ধারে ও মিথ্যা বলায় অপ্রতিদ্বন্ধী।তার এসব আচরণের জন্য পরিবারে ও পাড়ায় খারাপ মেয়ে হিসাবে পরিগণিত।মেয়ের এসব কাজে বাঁধা দেওয়ায় মা প্রায় শত্রুতে পরিণত হয়েছেন।মায়ের সাথে একাধিকবার ঝগড়াঝাটি করে আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেছে।ইতোমধ্যেই অগণিত ছেলের সাথে প্রেম(তার সংঙায় ফ্রেন্ডশিপ!) এক ছেলের সাথে পালিয়ে যাওয়া আর এক বিবাহিত ব্যক্তির সংসার ভাঙ্গাও হয়ে গেছে।নোভা এখন নিজ পরিবারেই সবচেয়ে অশান্তি ও ঘৃণার পাত্রী।কিন্তু তারপরও তার আচরণের কোন পরিবর্তন নেই।নেই কোন অনুশোচনা।বরং এসবের জন্য কার ঘাড়ে দোষ চাপানো যায় তা নিয়ে ফন্দি আঁটতে ব্যস্ত থাকে।


উপরোক্ত আচরণের জন্য নোভা নয় বরং দায়ী একটি মানসিক রোগ যার নাম হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (HPD=Histrionic Personality Disorder)।এ ব্যক্তিত্বের রোগীরা তাদের ব্যক্তিজীবন, সংসার ও সমাজকে কি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা নিচের বর্ণনাতেই বুঝতে পারবেন।এদের প্রেমের খেলার খপ্পরে পড়ে কতজনের জীবন যে তছনছ হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে তা কল্পনাকেও হার মানায়।অথচ আমরা অনেকেই জানি না যে এটা একটা মানসিক রোগ।মেয়েদের মধ্যে এর প্রাদূর্ভাব বেশী হওয়ায় নিচে  এরকম একটি মেয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো সহজে বোধগম্য হওয়ার জন্যঃ-

১)অপরিপক্কতাঃ-এটা এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায়ই এরা অপরিপক্কতার পরিচয় দেয়।বিবেচনা না করেই বার বার প্রেমে পড়া,পরিবারের অমতে বিয়ে করা,তুচ্ছ কারণেই সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলা,ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন,বয়স আনুপাতিক আচরণের অভাব ইত্যাদি তাদের মানসিক অপরিপক্কতার চিহ্ন বহন করে।

২)আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকাঃ-এরা সবসময় সবার মাঝে মনোযোগ ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায়।এটা হাসিল করার জন্য এরা নানারকম উপায় অবলম্বন করে।এদের হাসি,গল্প,কথা বলার স্ট্যাইল,আধুনিকতা সবকিছুই চিত্তাকর্ষক।

৩)পরনির্ভরশীলতাঃ-এরা প্রায়ই কারো না কারোর উপর নির্ভরশীল থাকে এবং নিজ কার্য সিদ্ধির জন্য অন্যকে খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারে।কোন কোন ক্ষেত্রে এরা অন্যের কথায় এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে জীবনের মূল্যবান অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলতে পারে বা সমূহ বিপদে পড়তে পারে।এক অর্থে এরা বেশ বোকা।প্রতারকরা প্রায়শই এদেরকে মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে নানা সর্বনাশ করে থাকে।

৪)আবেগের বৈপরীত্যঃ-এরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ।বিশেষতঃ নিজ ইচ্ছা পূরণের জন্য এরা আবেগকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করে।এদের কাঁদতেও বেশী সময় লাগে না আবার কাঁদাতেও বেশী সময় লাগে না।এদের আবেগ পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমান।ফলে এদের নিকটজনেরা অনেকসময় বুঝতে পারেনা কী করলে তার মন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

৫)বিপরীতলিঙ্গের প্রতি তীব্র আকর্ষণঃ-এ ব্যক্তিত্বের মেয়েরা মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের সাথে মেলামেশা করতে বেশী আগ্রহী থাকে ফলে এদের অনেক ছেলে বন্ধু থাকে।ছেলে-বুড়ো সকল পছন্দের পুরুষকে এরা নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে।মুখে অনাত্মীয় পুরুষদের বন্ধু,বড় ভাই,ছোট ভাই,মামা,আঙ্কেল ডাকলেও অনেকক্ষেত্রেই সে তাদের সাথে প্রেমিকার মত আচরণ করে।অনেকসময় এরা একইসাথে একাধিক জনের সাথে প্রেম/পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।এমনকি বিয়ের পরেও তাদের পরপুরুষের প্রতি সর্বদা আকৃষ্ট হতে দেখা যায়।ফলে এরা প্রায়শঃই পরিবার বা সমাজে দুষ্ট বা খারাপ চরিত্রের মেয়ে বলে বিবেচিত হয়।

৬)অগভীর আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কঃ-এরা মানুষের সাথে এত ও দ্রুত ঘনিষ্টভাবে মিশতে পারে যে দেখলে মনে হবে তাকে ছাড়া সে বাঁচবে না।সকল ক্ষেত্রে ভাইয়া’' ও ‘তুমি’ দ্রুত ঘনিষ্ট সম্পর্ক স্থাপনের জন্য হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়।কিন্তু বাস্তবতা হলো এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারোর সাথেই গভীরভাবে সম্পর্কে জড়াতে পারে না।ফলে কারো সাথে সম্পর্কের বিচ্ছেদ হলে যার সাথে বিচ্ছেদ হলো তার জীবন তছনছ হয়ে গেলেও এদের খুব বেশী বিচলিত হতে দেখা যায় না।তবে এদের জীবনে কখনও কখনও তার স্বপ্নের মানুষ এসে হাজির হতে পারে যার সাথে এরা লাভ অবসেশনে জড়িয়ে যায়।মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটাকে সম্পর্কের গভীরতা বলা যায় না;বরং এটি আরেকটি মানসিক রোগ।

৭)কামোদ্দীপক পোশাকঃ-যে ধরনের পোশাক পরিধান করলে বা সাজগোজ করলে নিজের দেহকে যৌনাকর্ষণের উপলক্ষ্য বানানো যায় সেদিকে এদের মনোযোগ খুব বেশী থাকে।আধুনিক পোশাক বিশেষতঃ যেসব পোষাক পরলে দেহের সৌন্দর্য্য ফুটে উঠে তার দিকে এদের বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়।কেউ কেউ ‘টম বয় হিসাবেও  বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।

৮)চাহনিঃ-পুরুষ আকর্ষণের এটা তাদের গুরুত্বপূর্ণ মারণাস্ত্র।কোন ছেলে ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকালে অন্য মেয়েরা যেখানে বিব্রত বা বিরক্তি বোধ করে সেখানে এরা তার দিকে সরাসরি বা আড়চোখে বার বার কৌতুহলী দৃষ্টিপাত করে যা পুরুষদের কাছে প্রশ্রয় হিসাবে বিবেচিত হয়।

৯)কথাবার্তাঃ-এদের গলার স্বর ও কথা বলার স্টাইল অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়।সেটাকে আরও আকর্ষণীয় করতে ইংরেজী শেখা ও তার  ব্যবহারের প্রতি এদের বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়।এরা ইচ্ছা করেই অর্ধসমাপ্ত কথা বলে থাকে যেন পরবর্তী অংশ শোনা বা জানার জন্য অন্যরা আকর্ষিত হয়।যেমন এদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেখা যাবে মন ভালোনেই ’,‘কত্ত বড় বাঁচা বাঁচলাম ,‘বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না’‘বিপদে পড়তে যাচ্ছি,দোয়া করিও’‘আজ আমার জীবনে বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে’,‘মানুষ এত্ত খারাপ হতে পারে… এ ধরনের কথাবার্তা যেন পাঠক ‘কেন’ সেটা জানায় আগ্রহী হয়ে উঠে।আবার কারণ জানতে চাইলেই যে সোজা উত্তর পাওয়া যাবে তা নাও হতে পারে।এক্ষেত্রেও আগ্রহ ধরে রাখার জন্য ‘জানি না’, ‘বলব না’, ‘সব কথা কি বলা যায়’, ‘তোমাকে বলা যাবে না’, ‘বলে কী লাভ বলো’ ইত্যাদি বলতে পারে।এটা তাদের মূল বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ আকর্ষণ বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার প্রয়াস মাত্র।

১০)ডাহা মিথ্যুকঃ-মিথ্যা বলায় এদের গুণ শৈল্পিক পর্যায়ের।এদের মিথ্যাকে অনেকসময় সত্যের চেয়েও বেশী সত্য মনে হয়।এক পলকে এরা একজনকে ফেরেশতা থেকে শয়তান বা শয়তান থেকে ফেরেশতা  বানাতে সিদ্ধহস্ত।অনেক সময় এরা তার পছন্দের পুরুষকে পেতে নিজ জীবনের সীমাহীন কষ্টের মিথ্যা কাহিনী রচনা করে যা  ঐ ব্যক্তিকে তার প্রতি সহানুভুতিশীল হতে বাধ্য করে।

১১)উচ্চভিলাস ও লোভঃ-এরা সাধারণতঃ উচ্চভিলাসী ,লোভী ও স্বার্থপর হয়।অর্থ ও উচ্চ সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য নৈতিকতা,সম্পর্ক,পরিবার,সমাজ কিংবা ধর্ম সবকিছু এরা ত্যাগ করতে পারে।অনেকসময় দেখা যায় এরা তাদের মোবাইলের খরচ,দামী গিফট,ভালো রেস্তোরায় খাওয়া বা ঘুরে বেড়ানোর খরচ তার ছেলে বন্ধুদের কাছ থেকেই আদায় করে থাকে।একটু বেশী ভালবাসা,অর্থ বা উচ্চ সামাজিক মর্যাদার কাউকে পেলে সে সহজেই বর্তমান প্রেমের সম্পর্ক ভেঙ্গে তার কাছে চলে যেতে কুন্ঠাবোধ করে না।

১২)অভিনয় দক্ষতাঃ-এরা অভিনয় করতে দারুন পটু।এজন্য এদেরকে ড্রামা কুইনও বলা হয়। অবাক হলেও সত্যি মিডিয়া জগতে রোমান্টিক অভিনেত্রী হিসাবে যারা চরম খ্যাতি পেয়েছেন তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ ব্যক্তিত্বের শিকার।অনেকসময় এরা একই সাথে একাধিকজনের সাথে প্রেম করে এবং সুনিপূণ অভিনয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়।অধর্মের কাজ করার পরও এরা অনেকসময় এমন ধর্মীয়ভাবের কথা বলে যে তার দ্বারা এরকম কাজ সংঘটিত হতে পারে এরকম ভাবাও কঠিন হয়ে পড়ে।

১৩)প্রেমের তীব্রতাঃ-এদের প্রেম এত তীব্র ও আকর্ষণীয় যে একবার এদের সাথে প্রেমে জড়ালে সারাজীবন তাকে প্রেমভিখারী হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়।এদের প্রেমিকদের অনেকেই লাভ অবসেশনে চলে যায়;কেউ কেউ প্রতিশোধমূলক নানা কর্মকান্ড ঘটিয়ে থাকে।তবে এরাও লাভ অবসেশনে জড়িয়ে যেতে পারে যদি তার পছন্দের পুরুষ তার আহবানে সাড়া না দেয়।তখন তাকে পেতে তার সকল গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে তার পিছনে যমের মত লাগে।

১৪)যৌনশীতলতাঃ-পুরুষ আকর্ষণের এদের প্রধান অস্ত্র যৌনাচরণ হলেও এরা যৌনজীবন খুব বেশী উপভোগ করে না।যৌনশীতলতার জন্য অনেকসময় এরা নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কও এড়িয়ে চলে।

১৫)আত্মহত্যার প্রবণতাঃ-এদের অনেকেরই জীবনবৃত্তান্তে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া,আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করার ইতিহাস থাকে।বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য অন্যকে জব্দ করতেই আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে থাকে।তবে কখনও কখনও তীব্র আবেগ তাড়িত হয়ে এরা আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে।

১৬)অসুস্থ পারিবারিক সম্পর্কঃএরা  অনেকক্ষেত্রেই বাবার প্রশ্রয় বেশী পেয়ে থাকে এবং মায়ের সাথে সম্পর্ক বেশ খানিকটা তিক্ত থাকে।সম্ভবতঃ ফ্রয়েডের লিঙ্গিক ত্বত্ত্ব এদের ক্ষেত্রে প্রকটভাবে কাজ করে।তবে আমার মনে হয় মায়েরা এদের অনৈতিক আচরণের ব্যাপারে বেশী খেয়াল করে ও তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে বলেই মায়েদের সাথে এদের সম্পর্ক প্রায়শই তিক্ত থাকে।ভাই-বোনদের সাথেও স্বার্থের দ্বন্ধ লেগেই থাকে।এদের কারো কারো রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে ছেলেবন্ধুর সাথে রাত কাটানোর ইতিহাসও থাকে।

উপরে যে উপসর্গগুলো আলোচিত হলো তা সব হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের রোগীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে;কারণ রোগের তীব্রতা ও উপসর্গের সামগ্রিক উপস্থিতি ব্যক্তি বিশেষে পার্থক্য হয়তাছাড়া এসব উপসর্গের দু’ একটা সাধারণ মানুষের মাঝেও থাকতে পারে।সুতরাং এসব উপসর্গের কিছু মিলে গেলেই তাকে হিস্ট্রিওনিক না ভেবে বরং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সাথে পরামর্শ করে নিশ্চিত হতে হবে।

এতক্ষণ কেবল নেগেটিভ কথাই বলা হলো।আমার পর্যবেক্ষণে এদের সবচেয়ে পজিটিভ দিক হলো এদের মেধা এবং নন-একাডেমিক গুণ যেমন নাচ-গান,ছবি আঁকা ইত্যাদি।অধিকাংশ হিস্ট্রিওনিকরা যথেষ্ট মেধাবী হয়ে থাকে এবং অন্যন্য গুণে গুণান্বিতও হয়ে থাকে।এদের মেধা ও গুণের সঠিক পরিচর্যা হলে এরা জীবনে অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারে।কিন্তু দুঃখের বিষয় উঠতি বয়সেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণজনিত জটিলতায় প্রায়শই এদের মেধা বিকাশের অকাল মৃত্যু ঘটে।


উপসর্গগুলো সহজে মনে রাখার উপায়(Mnemonic)- এরা যেহেতু সবসময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে ও প্রশংসিত হতে পছন্দ করে তাই তাদের উপসর্গগুলোকে "PRAISE ME" হিসাবে মনে রাখা সহজ-

Provocative (or seductive) behavior

Relationships are considered more intimate than they actually are

Attention-seeking

Influenced easily

Speech (style) wants to impress; lacks detail

Emotional lability; shallowness

Make-up; physical appearance is used to draw attention to self

Exaggerated emotions; theatrical


রোগের প্রাদূর্ভাবঃEmory University School of Medicine এর সাইকোলজিস্ট Nadine Kaslow এর মতে সাধারণ জনসংখ্যার ২%-৩% এ রোগে ভূগে থাকেন।সে হিসাবে বাংলাদেশে আনুমানিক ৩০লক্ষ-৫০লক্ষ এ রোগের রোগী রয়েছে যাদের সিংহভাগই নারী।সমগ্র জীবনে এদের প্রতিজনের দ্বারা যদি সর্বনিম্ন ২জনও প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে প্রায় ৬০লক্ষ থেকে ১কোটি প্রেমিক-প্রেমিকা ও পাণিগ্রহণকারী শুধু এ রোগের কারণে সম্পর্ক,বিয়ে ও প্রেমে প্রতারিত বা ব্যর্থ হয়ে থাকেসংখ্যাটা কি যথেষ্ট ভয়ংকর নয়?হয়ত এ কারণেই চারিদিকে প্রেমে এত প্রতারণা, ব্যর্থতা, ব্রেক-আপ ও পরকীয়ার ছড়াছড়ি!আর এসবের সম্ভাব্য পরিণতিতে বিষণ্নতা, আত্মহত্যা, অগ্রহণযোগ্য যৌনাচার ও যৌন সহিংসতাসহ অন্যন্য অপরাধও বাড়ছে।সম্মানজনক আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক, পারিবারিক-সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে এ রোগটি। 

উল্লেখ থাকে যে সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত অংশে এ রোগের প্রাদূর্ভাব বেশী।তবে তা সমাজের সকল স্তরের মাঝেই কমবেশী পাওয়া যায়।আমি আবারও উল্লেখ করতে চাই এ রোগে মেয়েরা বেশী ভূগলেও পুরুষদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়।

এ রোগের উপসর্গের প্রকাশ সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল অর্থাৎ ১৩-১৪বছর বয়স থেকেই শুরু হতে পারে এবং ২০বছর পার হওয়ার আগেই পূর্ণ বিকশিত হতে দেখা যায়।আর এ রোগ তারা প্রায় পুরো জীবনই বহন করে যদিও উপসর্গের সামগ্রিকতা, তীব্রতা ও ধরন বিষণ্নতা, অপ্রাপ্তি, কষ্ট, মানুষের ঘৃণা, পারিবাবিক-সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা ও ক্ষেত্রবিশেষে আত্মোপলব্ধির দ্বারা পরিমার্জিত হয়।


কেন এমন হয়?- Emory University School of Medicine এর সাইকোলজিস্ট Nadine Kaslow এর কারণ হিসাবে চমৎকারভাবে বলেছেন ‘Nature & nurture’।অর্থাৎ এসব ব্যক্তি জেনেটিক্যালি এ ব্যক্তিত্বের ঝুঁকি নিয়ে জন্মায় এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তা বিকশিত হতে সাহায্য করে।দূর্ভাগ্যজনকভাবে অনিয়ন্ত্রিত ও সর্বব্যাপি ইরোটিক ক্যাপিটালিজমের বিস্তারের কারণে ও এ বিষয়ে অভিভাবকদের অজ্ঞতার সুযোগে এ ধরনের ব্যক্তিত্ব ভয়াবহভাবে বিকশিত হচ্ছে যা পারিবারিক,সামাজিক ও ধর্মীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।


সহরোগঃহিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের রোগীদের মাঝে বিষণ্নতা (depression),অস্থিরতা (anxiety disorders), আতঙ্ক রোগ (panic disorder), খাওয়ায় অরুচি (anorexia nervosa), শরীরে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ যার চিকিৎশাস্ত্রীয় কারণ পাওয়া যায় না  (somatoform disorders), মাদকাসক্তি (substance use disorder), প্রিয় মানুষের দূরে চলে যাওয়ায় ভেঙ্গে পড়া (attachment disorders, including reactive attachment disorder),  অসামাজিক ব্যক্তিত্ব (বেয়াদবি করা, অপরাধ করা, প্রতারণা করা, দেহব্যবসা করা, শারীরিক সহিংসতা…), নার্সিসিস্টিক ব্যক্তিত্ব (নিজের গুণে নিজেই এত বেশি মুগ্ধ থাকে যে দুনিয়ার বাকী সবাইকে অযোগ্য মনে করে।ছেলে বাছতে বাছতে এদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যেতে পারে…) ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে।


চিকিৎসাঃ-এদের চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন;কারণ এদের বেশীরভাগই নিজেদের ব্যক্তিত্বকে সমস্যা হিসাবে মানতে নারাজ।এরা সাধারণতঃ বিষন্নতা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসে।হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার-এই সমস্যার কোন ঔষধি চিকিৎসা নেই।সাইকোথেরাপিই একমাত্র ভরসা।তাই এ রোগে আক্রান্তদের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।


কোথায় চিকিৎসা পাবেন?-জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টটিউট,শ্যামলী,ঢাকা;বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউ. হাসপাতাল(পিজি হাসপাতাল)-এর মানসিক রোগ বহির্বিভাগ;সকল মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগ বহির্বিভাগ। এছাড়াও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের ব্যক্তিগত চেম্বারে আপনি এ চিকিৎসা পেতে পারেন।

তবে সফল চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ও সাইকোথোপিস্টদের বিশেষ সতর্কতা পালন করতে হবে বিশেষ করে যারা জুনিয়র পেশাজীবি।কারণ হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের রোগীরা মানুষকে প্রভাবিত করার অসাধারণ ক্ষমতা চিকিৎসকদের উপরও প্রয়োগ করে থাকেন।ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসক নিজেই তাদের ফাঁদে পড়ে যান।কখনও এ অবস্থা সৃষ্টি হলে বা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে কৌশলে রোগিনীকে দক্ষতাসম্পন্ন অন্য আরেকজন চিকিৎসক বা সাইকোথোপিস্টের নিকট রেফার করা উচিৎ। 


একটি গুরুত্বপূর্ণ বইঃদীর্ঘদিন এফবিআই-এ কাজ করা প্রাক্তন বিশেষ এজেন্ট জো নাভাররো’র লেখা “How to Spot a Histrionic Personality” ব্যাপক সাড়া জাগায়।কারণ এ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণীরা যেমন অপরাধ করে, আবার নিজেরাও নানা সহিংসতার শিকার হয়।কিন্তু তদন্তকালে তাদের অভিনয় দক্ষতা ও মিথ্যাচারের কারণে অনেক তদন্ত কর্মকর্তা সহজেই বিভ্রান্ত হন;এমনকি তার সাথে আবেগের সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়েন।সে বিবেচনায় বইটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।তথ্য হিসাবে সেটাও সংযুক্ত করে দিলাম-


ধন্যবাদ যারা কষ্ট করে আর্টিকেলটি পড়লেন।সেই সাথে অনুরোধ থাকবে আপনার নিকটজন যাদের সাথে উপসর্গগুলোর মিল খুঁজে পাবেন এবং যারা এ ধরনের ব্যক্তিত্বের রোগীদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন তাদের কাছে এ রোগ সম্পর্কিত তথ্যগুলো শেয়ার করুন যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসার সুযোগ পায় এবং ভূক্তভোগীরা এদের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ না হয়।


বি.দ্রঃএই আর্টিকেলটি যথাসম্ভব সাধারণ ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছি এবং তা কেবল গণসচেতনতা তৈরি করার জন্য।রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।ধন্যবাদ।

সূত্রঃ
*Essentials of Medicine by M.E.Ullah
*Review of General Psychiarty by Howard H. Goldman

ছবিঃসকল ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে।এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক;এর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই।তারপরেও কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে কারো আপত্তি থাকলে তা জানা মাত্র সে ছবি বা ছবিসমূহ এই আর্টিকেল থেকে অপসারণ করা হবে।(All the images in this article are collected from different web sites & have been used for non-commercial purposes.If anyone has any objection of using these images,I’m assuring their removal upon getting valid complaint)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন