বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ASPD: যে রোগের কারণে মানুষ বখে যায়;হয়ে উঠে অপরাধী


কেরামত মাষ্টার পোষ্টমর্টেম শেষে ছেলের লাশ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।চোখের পানি আগেই শুকিয়ে গেছে।তারপরও ছেলের নিথর,রক্তাক্ত,শীতল দেহটায় হাত বুলাতেই ভিতরটা হু হু করে উঠলো।পর পর দুই মেয়ের পর আল্লাহ তাকে এই ছেলে দিয়েছিলেন।ছেলে বড় হয়ে সূর্যের মত আলো ছড়াবে তাই নাম রেখেছিলেন শামসু। ছোটকাল থেকেই ছিল খুব দুরন্ত ও জেদী।পিস্তল,চাকু আর তীর-ধনুক ছিল তার প্রিয় খেলনা।সারাদিন টিকটিকি মেরে যোগাড় করে রাখতো বাবা বাসায় ফিরে গুণে দিবে বলে।বাবাও ছেলের এ কর্মকান্ডে হেসে গড়াগড়ি যেতেন।একবারতো তীর ছুঁড়ে কাজের মেয়ে রাহেলার এক চোখ কানা করে দিল।‘ছেলেকে আদর দিয়ে মাথায় তুলেছো;টাইট দাও নাতো একদিন পস্তাতে হবে….তোমার ছেলে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলে….ওর জিদের কারণে মেয়ে দুটোকে একদিনের জন্যও মুরগীর রান খেতে দিতে পারি না।’-বউয়ের এরূপ কথায় মাষ্টার হেসে বলতেন দেখো বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।মাষ্টারের এই হাসি ম্লান হতে বেশীদিন লাগলো না।কতইবা বয়স হবে ১৩ কিংবা ১৪।

এরই মধ্যে মিথ্যা বলা,মুখে মুখে তর্ক করা,বোনদের মারধোর করা,টাকা না দিলে টাকা চুরি করা বা ঘরের জিনিস চুপ করে বেঁচে দেওয়া,স্কুলে গিয়ে মারপিট করা,মুরুব্বিদের সাথে বেয়াদবি করায় সবাই মাষ্টারকে উপদেশ দিতে লাগলেনছেলেতো বখে যাচ্ছে,শাসন করো’।কিন্তু এখন তাকে বোঝালেও কাজ হয় না, মারলেও কাজ হয় না।এরই মধ্যে টেনেটুনে এসএসসি পাশ করে অখ্যাত কলেজে ভর্তি হলো।বিধিবাম!কলেজে ঢুকেই জড়িয়ে গেল ছাত্র রাজনীতিতে।শামসু হয়ে গেল শামসু ভাই।একদিন পাশের বাড়ীর কামাল কাঁদতে কাঁদতে মাষ্টারকে বললেন ‘চাচা আপনার ছেলে আমার বউয়ের সাথে.... চাচা আমিতো শেষ’।বাড়ি ফেরার পর ছেলেকে বেধড়ক পেটালেন। অনুশোচনার পরিবর্তে তার চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে।এক পর্যায়ে বাবাকেই লাথি মেরে দিল।মাষ্টারের কাছেও সে হয়ে গেল ‘শামসু ভাই’।দু’ দু’বার এইচএসসি ফেল করার পর পড়াশোনা শেষ।এমন সময় দুবাই থেকে আসলো মাষ্টারের শালা।ভাগ্নের কুকীর্তির কথা শুনে তাকে দুবাই নিয়ে যেতে চাইলো।কিন্তু সে মামার কাছে বায়না ধরলো ব্যবসার জন্য টাকা দাও ‘আমি স্কুলের সামনে একটা বইয়ের দোকান দিব’।মাষ্টারও খুশি;স্কুলের সামনে বইয়ের দোকান দিলে ব্যবসাও ভালো হবে আর ছেলেও চোখের সামনে থাকবে।দোকান দেওয়ার ৭দিনের মধ্যেই ওটা হয়ে গেল ইভটিজিং সেন্টার।আর মাস পেরোনোর আগেই লোকাল থানার এস.আই জানালো ‘স্যার আপনার ছেলেতো বইয়ের দোকানে ইয়াবার ব্যবসা শুরু করেছে’।মাষ্টারের আশার শেষ আলোটুকুও নিভে গেল!এরই মধ্যে একদিন থানার ওসি মাষ্টারকে ডেকে পাঠালেন।‘মাষ্টার সাহেব আপনার ছেলে শীলা নামের যে মেয়েটির পিছনে লেগেছে সে কিন্তু র‌্যাবের এক উর্ধতন কর্মকর্তার ভাগ্নি।ছেলেকে হারাতে না চাইলে এ পথ থেকে সরে যেতে বলেন’-ওসি সাহেবের এ সতর্কবাণীর অর্থ বুঝতে একটুকুও কষ্ট হলোনা মাষ্টারের।ঘরে ফিরেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।মা-বাপ মিলে ছেলের হাতে-পায়ে ধরলো।সেদিনও যথারীতি ক্লাশ নিচ্ছিলেন কেরামত মাষ্টার।পিয়ন হামিদ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো ‘স্যার আপনার সর্বনাশ হয়ে গেছে।শামসু ভাই শীলা আপাকে কিডন্যাপ করতে না পেরে তার পেটে ছুরি মেরে পালিয়েছে’।থানার ওসি এসে শাসিয়ে গেছেন ছেলেকে খুঁজে বের করে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।টেনশনে বাসার সবাই রাত জেগে আছে।হঠাৎ রাত ২টার দিকে ড্রইং রুমে কান্নার রোল।মাষ্টার দৌড়ে ও রুমে যেতেই বউ চিৎকার করে বললো ‘ওগো আমার শামসু আর নাই’।টিভিতে ব্রেকিং নিউজ যাচ্ছে ‘র‌্যাবের ক্রসফায়ারে পল্লবীর সন্ত্রাসী ধলা শামসু নিহত’।বাড়ি পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।ছেলের লাশের দিকে তাকিয়ে তার শুধু একটাই প্রশ্ন কোন ভুলে তার ছেলের জীবন এমন হলো?এ প্রশ্ন বাংলাদেশের আরও প্রায় ৩২ লক্ষ বাবার।উত্তরঃ ASPD(Anti-Social Personality Disorder)।এটা এমন একটা মানসিক রোগ যা অপরাধীর জন্ম দেয়।   
উপসর্গসমূহঃএ রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গগুলোর সবিস্তারে নীচে বর্ণনা দেওয়া হলো।তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে একজনের মধ্যে একই সাথে সব উপসর্গ উপস্থিত নাও থাকতে পারে।আবার উপসর্গের তীব্রতাও সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রকাশ পায় না।যাদের মধ্যে এগুলো হালকাভাবে উপস্থিত থাকে তারা সমাজে বেয়াদব/উশৃংঙ্খল নামেই বেশী পরিচিত থাকে,বড় ধরণের অপরাধ এরা করে না।আর যাদের মধ্যে এসব উপসর্গ প্রকটভাবে প্রকাশ পায় তাদের সাইকোপ্যাথ বলে যারা অনেক সময় দাগী আসামী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

০১)পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করাঃপারিবারিক,সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোন নিয়মেই এদের বেঁধে রাখা যায় না।গুরুজনদের সম্মান করে না,ছোটদের আদর করে না।বড়দের মুখে মুখে তর্ক করে।কেউ উপদেশ দিলে তাকেই দশ কথা শুনিয়ে দেয়।নামাজ পড়তে বললে ধার্মিকরা কত বড় শয়তান হতে পারে সে বিষয়ে একটা লেকচার দিয়ে দিবে কিংবা ‘নামাজ না পড়লেও আমার ঈমান বহুত শক্ত’ এ টাইপের কথা শুনতে হবে।অনেক সময় এরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের(সাঃ) বিরুদ্ধে কথা বলতেও দ্বিধা করে না।লেখাপড়া করা,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলা ও শিক্ষকদের মান্য করা এদের সিলেবাসে নেই।পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে গন্ডগোল বাঁধিয়ে আনন্দ নষ্ট করতে এরা সিদ্ধহস্ত।এক কথায় বেয়াদব হিসাবে চিহ্নিত হতে যেসব বদ গুণ দরকার তার সবই এদের থাকে।
০২)মিথ্যা বলাঃবলাবাহুল্য এরা ডাহা মিথ্যুক হয়।প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এরা মিথ্যা কথা বলে।নিছক মজা পাওয়ার জন্যও অনেক সময় এরা মিথ্যা কথা বলে থাকে।সে তার মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে প্রায়ই সাগরেদদের নিয়ে নাটক সাজায়।ধরুন বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করলো ‘তুই নাকি আজ সকালে অাকবর সাহেবের মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার সময় আজেবাজে কথা বলেছিস?’।তার উত্তরটা হবে ‘আল্লাহর কসম আপনি শিপনকে ডেকে জিজ্ঞাস করেন আমি সকাল খেকে এর ওখানে একসাথে পড়াশোনা করছিলাম’।যথারীতি সাগরেদ শিপন এসে সাফাই সাক্ষী দিয়ে যাবে জানের ভয়ে।
০৩)প্রতারণাঃএমনিতে এদের আচার আচরণ রুক্ষ হলেও প্রতারণা কর্মে এদের অভিনয়,প্রলোভন ও আচরণের মিষ্টতায় অনেকেই এদের ফাঁদে পা দেয়।নানা অজুহাতে এরা মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা ও অন্যন্য জিনিস ধার নেয় এ নিয়তে যে সে তা কোনদিনই ফেরত দিবে না।শুধুমাত্র অর্থলোভে কিংবা ভোগের উদ্দেশ্যে বড়লোকের মেয়ে বা সুন্দরী মেয়েদের সাথে প্রতারণামূলক প্রেম করে থাকে।অনেক ক্ষেত্রে এদের একইসাথে একাধিক জনের সাথে প্রেম/শারীরিক সম্পর্ক থাকে।লন্ড্রী থেকে ধার নেওয়া ভাল কাপড়,বন্ধুর দামী জুতা ও সানগ্লাস,বাপের পকেট কাটা টাকা,পরিচিত ড্রাইভারের গাড়ী,ঠোঁটস্থ মুখস্ত ১বা ২টা ইংরেজী রোমান্টিক কবিতা সম্বল করে এরা সহজেই দূর্বল মনের মেয়েদের প্রতারিত করে থাকে।এরা ব্ল্যাকমেলিংয়েও ওস্তাদ।ঘনিষ্ট মূহুর্তের ছবি ধারণ করে কিংবা অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা রেকর্ড করে এরা খুব সহজেই মেয়েদের ব্ল্যাকমেলিং করে নানা অনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারে।
০৪)জীবনের নিরাপত্তা তুচ্ছজ্ঞান করাঃমানুষের জীবন যে মহামূল্যবান এ উপলব্ধি তাদের মধ্যে কখনোই কাজ করে না।না নিজের জন্য না অন্যের জন্য।ফলে একদিকে সে যেমন নিজের জীবনকে তছনছ করে ঠিক তেমনি অন্যের জীবনকেও ধ্বংস করতে পরোয়া করে না।সাঁতার না জানা সত্বেও সমুদ্রের গভীরে চলে যাওয়া,টপ গিয়ারে গাড়ি চালানো,উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেওয়া ইত্যাদি হিরোইক কাজ করতে এরা গৌরব বোধ করে।এদের অনেকেরই চল্লিশ পেরোনোর আগেই আত্মহত্যা,দূর্ঘটনাজনিত বা ক্রিমিনাল ভায়োলেন্সে মারা যাওয়ার হিস্ট্রি থাকে।তাদের এরূপ হিরোইক কাজের জন্যও অনেক টিন এজার মেয়ে এদের প্রেমে পড়ে যায় নিজ জীবন ধ্বংস করতে।
০৫)আগ্রাসী ও আক্রমনাত্মক আচরণঃতাদের এই আক্রমণাত্মক আচরণ ঘরে বাইরে সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়।শাসন করলে কিংবা চাহিদা মোতাবেক কিছু না পেলে ঘরের জিনিস ভাংচুর করা,ভাই-বোনদের পেটানো এমনকি বাপ-মার গায়ে হাত তোলাও নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।পাড়ার ছেলেপেলে পেটানো,রিক্সাওয়ালা পেটানো,বিভিন্ন জনকে হুমকি দেওয়া,মেয়েদের কিডন্যাপ করার হুমকি দেওয়া,পাওনাদারদের ভয়ভীতি দেখানো ইত্যাদির অভিযোগে এদের অভিভাবকদের প্রায়ই কথা শুনতে হয়।ছোটবেলায় এদের অনেকেই নিরীহ প্রাণী যেমন ব্যাঙ,বিড়াল বা টিকটিকি পিটিয়ে মারে নিছক মজা পাওয়ার জন্য।
০৬)দায়িত্ব ও কান্ডজ্ঞানহীনতাঃএদেরকে কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া কিংবা সুবিবেচনা করে কাজ করতে বলেছেন তো সর্বনাশ!শক্ত সামর্থ্য ছেলে থাকার পরও বুড়ো বাপকেই বাজার করতে হয় কিংবা ইউটিলিটি বিল দেওয়ার জন্য ব্যাংকে লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়।দায়িত্বহীনতার জন্য অনেক সময় এদের বার বার চাকুরী হারাতে বা পাল্টাতে হয়।হয়তো একারণেই এদের একটা বিরাট অংশ ব্যবসা করে জীবন নির্বাহ করে থাকে।
০৭)সবকাজে তাড়াহুড়ো করাঃভাবিয়া করিও কাজ,করিয়া ভাবিওনা’-এ কথা এদের জন্য একদম প্রযোজ্য নয়।যে কোন আইডিয়া মাথায় আসলে তা তাদের তৎক্ষণাৎ করা চাই।আর এই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে প্রায়ই এরা অসফল হয়
০৮)অন্যের অধিকার খর্ব করাঃঅন্যের অধিকার তথা মানবাধিকার শব্দটি এদের অভিধানে নেই।কারো অধিকার ক্ষুন্ন করা যে অন্যায় ও অপরাধ তা তারা মোটেই পরোয়া করে না।বরং এরা কারো অধিকার খর্ব করাকে শক্তিমত্তার পরিচায়ক ও গৌরবের মনে করে।
০৯)যৌন নির্যাতন করাঃবিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ থেকে জানা যায় ধর্ষণের মূল কারণ মূলত যৌনানন্দ লাভ করা নয়,বরং নারীর অধিকার খর্ব করা বা নারীকে দমিয়ে রাখা।যেহেতু এরা অন্যের অধিকার খর্ব করতে সিদ্ধহস্ত হয়ত এ কারণেই ধর্ষকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে। ইভটিজিং,অপহরণ এবং মেয়েদের প্রতি অন্যন্য যৌন সহিংসতার ইতিহাস এদের প্রায় প্রত্যেকেরই জীবনে থাকে।কখনও কখনও এ কারণে তাদের আইনি পরিণতিও ভোগ করতে হয়।
১০)অনুশোচনাহীনতাঃসাধারণ মানুষ কোন অন্যায় করলে সে অনুশোচনায় ভোগে;কখনও সে তা প্রকাশ করে কিংবা গোপন রাখে।এই অনুশোচনা তাকে সংশোধিত করে বা পরবর্তী অন্যায়টা করতে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের কোন ধরণের অনুশোচনাবোধ কাজ করে না কিংবা করলেও তা এতটাই ক্ষণস্থায়ী থাকে যে সেটা অপরাধ প্রবণতা রোধে কোন কার্যকরী ভূমিকা রাখে না।এ কারণেই এরা একের পর এক অপরাধ করে যেতে থাকে।
১১)ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করাঃভুল করা মানুষের সহজাত আচরণ।ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই সে এগিয়ে যায়;হয়ে উঠে অভিজ্ঞ।কিন্তু ASPD রোগীদের ব্রেন ঠিক আর বেঠিকের পার্থক্য করতে অসমর্থ।তাই তারা ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না।যে কারণে তারা একই ভুল বার বার করতে থাকে।

১২)তীব্র আত্মকেদ্রিক ও স্বার্থপরতাঃএদের পুরো জীবনটাই লোভ,স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতায় ভরা।ছোটবেলা থেকেই এরা মুগরীর রান বা মাছের পেটি তাদের পাতে চাইই চাই।অন্য ভাইবোন ছেঁড়া কাপড়-চোপড় পরে থাকুক তাতে কিছু আসে যায় না,তারটা হলেই হলো।বাইরেও এদের একই অবস্থা।নিজের যতই থাকুক অন্যের জিনিস ভাল লাগলেই সেটা তার পেতেই হবে।এ কারণে এরা চুরি করতেও দ্বিধা করে না।এদের পাহাড় সমান সম্পদ থাকলেও মন ভরে না,আরও চাই।কিন্তু দেওয়ার সময় এদের সংকীর্ণতা সূচের ছিদ্রকেও হার মানায়।তবে মাঝে মাঝে এদের দানশীল হতে দেখা যায়।সেটাও ব্যক্তিস্বার্থেই।কখনও লোকজনকে দলে ভেড়ানোর জন্য,কখনও আবার তাদের দিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য,আবার কখনোবা নিজের কুকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার জন্য
১৩)নিজেকে বিরাট কিছু মনে করাঃউপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে আপনারা তো একটা ব্যাপার বুঝেই গেছেন এদের দাপটের কাছে প্রায় সবাই নতজানু হয়ে থাকে।কাজেই সে নিজেকে বিরাট কিছু মনে করতেই পারে।
১৪)সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে অসমর্থতাঃতাদের উপরোক্ত বিভিন্ন বদগুণ তাদেরকে মানুষের সাথে সুস্থ সম্পর্ক তৈরী করতে বা বজায় রাখতে দেয় না।যারা একান্ত বাধ্য যেমন বাপ-মা.ভাই-বোন,স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে তাদের সাথে তার মানসিক দূরত্ব থাকে যোজন যোজন দূর।এক অর্থে এরা অনেকের মাঝে বাস করেও বড় বেশী একা।
১৫)মাদকাসক্তিঃএদের অনেককেই মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।সিগারেট থেকে শুরু করে মদ-ইয়াবা পর্যন্ত সেবন করে থাকে।অার নেশার টাকা যোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ে অন্যন্য অপরাধের সঙ্গেও।অনেকে মাদক ব্যবসার সাথেও জড়িয়ে পড়ে।
১৬)দেশের প্রচলিত আইন ভাঙ্গাঃএরা যেহেতু পারিবারিক,সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম-কানুন কিছুই মানতে চায় না কাজেই দেশের প্রচলিত আইনের প্রতিও তাদের কোন শ্রদ্ধা নেই।এদের অনেকেরই বিরুদ্ধে থানায় জিডি/মামলা থাকে।অনেকের জেল খাটার ইতিহাসও থাকে।
রোগ নির্ণয়ে বয়স বিবেচনা করা সংক্রান্ত আমার অভিমতঃবয়ঃসন্ধিকালে মেয়ে ছেলে উভয়েরই শরীরে প্রচুর পরিমাণে সেক্স হরমোন নিঃসৃত হয়।এর প্রভাবে এরা অনেক বেশী আবেগপ্রবণ থাকে এবং নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে চায় না।ছেলেদের ক্ষেত্রে টেসটস্টেরন হরমোনের কারণে এরা অনেক বেশী তেজী থাকে।কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই হরমোনের আধিক্য শরীরের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং এসব আচরণও গ্রহণযোগ্যমাত্রার মধ্যে চলে আসে।তাই মনোবিজ্ঞানীদের মতে এসব উপসর্গ ১৮ বছরের পরেও কারো ব্যক্তিত্বে রয়ে গেলেই কেবল তাকে ASPDর কেস বলা যাবে।কথা এখানেই শেষ নয়।যেহেতু পশ্চিমা বিশ্বের শীত প্রধান দেশে বয়ঃসন্ধিকাল একটু দেরীতে আসে তাই তারা ১৫বছর বয়সকে বয়ঃসন্ধিকাল হিসাবে ধরেন।ASPDর রোগী হিসাবে কাউকে চিহ্নিত করতে হলে ১৮ বছরের পরেই শুধুমাত্র এসব উপসর্গ থাকলে হবে না,উপরোক্ত উপসর্গসমূহের বেশীরভাগকেই ১৫ বছরের পূর্বেও অন্ততঃ এক বছরের জন্য থাকতে হবে;তখন এর নাম হবে CONDUCT DISORDER।মূল অসুখ এক হলেও শুধুমাত্র কয়েকটি উপসর্গের হেরফেরের কারণে দুই বয়সে একই ধরনের রোগকে দুই নামে ডাকা এবং উপসর্গের উপস্থিতি সত্বেও হরমোনের আধিক্যজনিত দোহাই দিয়ে রোগীকে ৩ বছর (১৫-১৮বছর) চিকিৎসার বাইরে রাখা আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করিনা।আমার মতে বয়ঃসন্ধিকালের আগেই যদি উপসর্গ প্রকাশ পায় তাহলে তখন থেকেই তার চিকিৎসা শুরু করা উচিত এবং ১৫-১৮বছর এই তিন বছর ফলোআপে রাখা উচিত।তাছাড়া আমাদের মত গ্রীষ্ম প্রধান দেশে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ১৩বছরেই বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়।আশা করি বিষয়টি আমাদের দেশের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ভেবে দেখবেন।কথাটা একারণে অবতারনা করলাম কারণ ১৮বছর বয়সে যখন রোগটা খানিকটা গভীর হয়ে যায় তখন এদেরকে চিকিৎসা গ্রহণ করানোটাও বেশ কঠিন হয়ে যায়;হয়তো এ কারণেই বিশ্বব্যাপী এ রেগের চিকিৎসা সফলতার হার বেশ কম।
ASPDর কারণঃঅন্যন্য মনোরোগের মত এ রোগের ব্যাপারেও রয়েছে নানা মত।গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো তুলে ধরা হলো-
০১।জেনেটিকঃঅনেকেই মনে করেন ASPDর রোগীরা ত্রুটিপূর্ণ জিন নিয়েই জন্মায়।তবে তারা এটাও বিশ্বাস করেন শিশুটির বেড়ে উঠার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অন্যন্য বিষয় রোগটিকে বিকষিত করে।সাধারণ অর্থে ‘জেনেটিক ক্রিমিনাল’ বা ‘জন্মগত অপরাধী’
০২।দেহের বায়োকেমিক্যাল পরিবর্তনঃASPDর রোগীদের রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী টেসটস্টেরনে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম সেরেটোনিন পাওয়া গেছে।এছাড়াও কিছু স্টাডিতে মনোঅ্যামাইন অক্সিডেজ-এ এর সাথে ASPDর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
০৩।পরিবেশ ও কালচারের প্রভাব-ASPDর রোগীদের শৈশবকালীন পরিবেশ বিশ্লেষণ করে অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও পরিবারের সদস্যদের বিশেষতঃ বাবা-মায়ের শিশুপালনের অদক্ষতা সুনির্দিষ্টভাবে শিশুর মনোজাগতিক বিষয়ের সঠিক পরিচর্যার অভাব এ রোগ বিকাশে ভূমিকা রাখে।
০৪)মস্তিষ্কের আঘাত-আমাদের ব্রেনের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স নৈতিকতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে।শিশুকালে আঘাতজনিত কারণে ব্রেনের এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে বাচ্চা বড় হয়ে ASPD-তে ভূগতে পারে।আবার লিম্বিক সিস্টেম থেকে যেসব সিগনাল প্রি-ফ্রন্টাল এরিয়ায় যায় তারা মূলতঃ আক্রমণাত্মক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।এক্ষেত্রে ব্রেনের অ্যামিগডালা মডারেটরের ভূমিকা পালন করে।মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে এটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ASPDর উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে।এজন্য পরিবারের সদস্যদের সদা সতর্ক থাকা দরকার যেন শিশুর মাথায় আঘাত না লাগে।
রোগের ব্যাপকতাঃসাধারণ জনসংখ্যার ৩% পুরুষ ও ১% মহিলা এ রোগের রোগী।মানসিক রোগ বহির্বিভাগে আগত রোগীদের ৩%-৩০% পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত।২০০২ সালের এক রিভিও এ দেখা যায় জেলখানার সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে ৪৭% পুরুষ ও ২১% মহিলা এ রোগে আক্রান্ত।তাছাড়া মাদকাসক্তদের একটা বিরাট অংশও এ রোগে ভূগছে।আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশ্বব্যাপী এ রোগের প্রিভ্যালেন্স হার বিবেচনায় সংখ্যাটি ২৪লক্ষ পুরুষ ও ৮লক্ষ নারী অর্থাৎ ৩২লক্ষ মানুষ এ রোগের রোগী হতে পারে।৩২লক্ষ মানুষ অপরাধপ্রবণতা নিয়ে বাস করছে আমাদের মাঝে!দিনকে দিন সামাজিক অপরাধ কেন বেড়ে যাচ্ছে এদেশে সম্ভবতঃ এ থেকে একটা ধারণা পাবেন আপনারা।
চিকিৎসাঃসাইকোথেরাপিই এ রোগের মুল চিকিৎসা।রোগীর সাথে সাথে পুরো ফ্যামেলিকেই থেরাপি নিতে হয়;কারণ পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব।এ রোগের সাথে অনেক সময় বিষণ্নতা ও সাইকোটিক উপসর্গ থাকে।এসব ক্ষেত্রে বিষণ্নতা বিরোধী ও এন্টি-সাইকোটিক ঔষধ দেয়া হয়।কোন কোন ক্ষেত্রে মাদকাসক্তিও থাকে;সেটারও যথাযথ চিকিৎসা দিতে হয়।
কোথায় চিকিৎসা পাবেনঃজাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট,শ্যামলী,ঢাকা;বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউ. হাসপাতাল(পিজি হাসপাতাল)-এর মানসিক রোগ বিভাগে;সকল মেডিকেল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগে।এছাড়াও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের ব্যক্তিগত চেম্বারে আপনি এ চিকিৎসা পাবেন।
চিকিৎসা সফলতার হারঃমোটেও আশাপ্রদ নয়।তার প্রধান কারণ এ রোগের রোগীরা নিজেদেরকে রোগী হিসাবে মানতে নারাজ।তাছাড়া চিকিৎসা গ্রহণে অস্বীকৃতি,ফলো-আপ না করা,অভিভাবকদের অসচেতনতা,চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রিতা,উপযুক্ত চিকিৎসকের অভাব,চিকিৎসকের প্রতি রোগীর অনাস্থা ও দূর্ব্যবহার ইত্যাদি কারণে এ রোগের চিকিৎসা সফলতার হার বেশ কম।তবে একটা মজার ব্যাপার হলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ রোগের উপসর্গ ও তার তীব্রতা কমতে থাকে এবং ৪০-৫০ বছর বয়সে অনেক রোগীরই প্রধান উপসর্গসমূহ বহুলাংশে কমে যায়।
কারা ঝুঁকিতে আছেনঃ
০১)১৫ বছরের নীচে যেসব বাচ্চার আচরণে উপরোক্ত উপসর্গসমূহের কয়েকটি হলেও প্রকাশ পায়।
০২)এ রোগে আক্রান্ত পিতা/মাতার সন্তানেরা।
০৩)যেসব শিশু প্রচন্ড শারীরিক,মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।
০৪)যেসব পরিবারে পারিবারিক কলহ প্রায় লেগেই থাকে সে পরিবারের সন্তানেরা।
০৫)যেসব শিশুর মা-বাবা পীড়াদায়ক বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে পৃথক হয়ে যায়।
০৬)মাদকাসক্ত পরিবারের শিশুরা।
০৭)যে সব পরিবারে পিতা/মাতা শিশুর সামনেই অবৈধ যৌনাচারে বার বার লিপ্ত হন।
০৮)মাথায় আঘাত প্রাপ্ত শিশুরা।
অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধঃ
০১)বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে যদি আপনার সন্তানের মধ্যে উপসর্গগুলোর ৩টিও প্রকাশ পায় তাহলে অনতিবিলম্বে একজন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।আপনার এই সচেতনতাটুকুই আপনার শিশুর ভবিষ্যতের জন্য বিরাট মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে।
০২)শিশুমনে প্রতিশোধপরায়ণতা বা যুদ্ধাংদেহী মনোভাব যেন তৈরি না হয় সেজন্য খেলনা হিসাবে পিস্তল, বন্দুক, চাকু ইত্যাদি দিবেন না।
০৩)পারিবারিক কলহ শিশুর মানসিকতায় প্রচন্ড প্রভাব ফেলে এ বিষয়ে সদা সতর্ক থাকুন।
০৪)নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এরকম সকল টিভি অনুষ্ঠান দেখা থেকে শিশুকে বিরত রাখুন।
সরকারের কাছে অনুরোধঃযেহেতু জেলখানার সিংহভাগ সাজাপ্রাপ্ত আসামী এ রোগের রোগী।সুতরাং তাদের চিকিৎসার জন্য প্রতিটি জেলেই একজন করে কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগের দাবী জানাচ্ছি এবং তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লোকাল থানার পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয় বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি।তা না হলে এরা জেল থেকে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।কারণ তাদের মধ্যে অনুশোচনাবোধ কাজ করে না।সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এটা হতে পারে খুবই কার্যকরী একটা উপায়।
বি.দ্রঃ
০১)এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক।রোগ নির্ণয়,চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
০২)গল্পটি কল্পনাপ্রসূত।
সূত্রসমূহঃ
01.Review of General Psychiarty by Howard H. Goldman
02.Current Medical Diagnosis & Treatment
03.Clinical Psychology by A.K.Agarwal
06.Fazel, Seena; Danesh, John (2002). "Serious mental disorder in 23 000 prisoners: A systematic review of 62 surveys". The Lancet 359 (9306): 545.
ছবিঃসকল ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে।এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক;এর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই।তারপরেও কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে কারো আপত্তি থাকলে তা জানা মাত্র সে ছবি বা ছবিসমূহ এই আর্টিকেল থেকে অপসারণ করা হবে।(All the images in this article are collected from different web sites & have been used for non-commercial purposes.If anyone has any objection of using these images,I’m assuring their removal upon getting valid complaint)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন